একসময় অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম এখন ৩০০ একরের মাছের খামারের মালিক। আট বছর আগে চাচার সহযোগিতায় মাছ চাষ শুরু করা তৌহিদুলের সব খরচ বাদ দিয়ে এখন বছরে আয় প্রায় তিন কোটি টাকা। চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার ওসমানপুর ইউনিয়নে শুধু তিনিই নন, কেবল মাছ চাষ করেই কোটিপতি হয়েছেন শতাধিক মানুষ। প্রায় ২০ হাজার মানুষের এই ইউনিয়নে একসময় পশুপালন, ধান চাষ ও খাল-বিলে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন বাসিন্দারা। তিন দশকের ব্যবধানে বাণিজ্যিক মাছ চাষ বদলে দিয়েছে এখানকার মানুষের জীবন। ইউনিয়নটির প্রায় সাত হাজার মানুষ এখন মাছ চাষের সঙ্গে জড়িত এবং স্থানীয় চাষিরা আশপাশের বিভিন্ন জেলা ও উপঞ্চলেও এই পেশা সম্প্রসারণ করেছেন। ১৯৮৬ সালে মুহুরী প্রকল্প বাস্তবায়নের পর জেগে ওঠা চরে নব্বইয়ের দশকে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা খামার তৈরি করে বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ শুরু করেন। তাঁদের সাফল্য দেখে পরে আরও অনেকে এই ব্যবসায় যুক্ত হন। উপজেলা মৎস্য কার্যালয় ও স্থানীয় চাষিদের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে ওসমানপুর ইউনিয়নের পশ্চিম বাঁশখালী, মুহুরী প্রকল্প ও পাতাকোট এলাকায় প্রায় ১৫ হাজার একর জমিতে মাছের খামার রয়েছে। জায়গার সংকটে এখানকার চাষিরা নোয়াখালী, ফেনী ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন চরসহ বিভিন্ন এলাকায় মাছ চাষ করছেন। মিরসরাইসহ বিভিন্ন উপজেলায় তাঁদের মাছের খামারের মোট আয়তন প্রায় ৪০ হাজার একর এবং এসব খামারে বছরে পাঁচ লাখ মেট্রিক টন কার্প-জাতীয় মাছ উৎপাদিত হয়। নব্বইয়ের দশকে এ অঞ্চলে প্রথম মাছ চাষ শুরু করেন আবুল খায়ের, মো. মোস্তফা, মোহাম্মদ মনি ও খোকন। পরে কামরুল হোসেন, ফরিদ উদ্দিন, কাউসার হামিদ, মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম, ইউনুছ মিয়া, নাঈম উদ্দিন ও আরিফ হোসেনসহ অনেকেই এই পেশায় যুক্ত হন। মাছ চাষ করে নিজের জীবন বদলে যাওয়ার কথা জানিয়ে মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম বলেন, আগে কোনোমতে জীবন চালানোর পর্যায়ে থাকলেও এখন তিনি কোটি টাকার হিসাব করতে পারেন এবং মাছ চাষের টাকায় নতুন পাকা ঘর, গরুর খামার ও জমি কিনেছেন। একই ইউনিয়নের বাঁশখালী গ্রামের মাছচাষি মোহাম্মদ ইউনুস মিয়া ১০ বছর আগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরি ছেড়ে সাত একর জমিতে মাছ চাষ শুরু করেন। বর্তমানে তাঁর ২০০ একরের খামার রয়েছে এবং তাঁর মাছের খামারে বছরে ৮ থেকে ১০ কোটি টাকার লেনদেন হয় বলে জানান তিনি। তবে ভালো মানের মাছের খাদ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়া এবং খাদ্যের মান নিয়ে চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করেন ইউনুস মিয়া। পাতাকোট এলাকার আরেক খামারি ফরিদুল ইসলাম প্রবাস জীবন ছেড়ে দেশে ফিরে চার শ একর খামারের মালিক হয়েছেন এবং মাছ চাষ তাকে অর্থ ও সম্মান দুটিই দিয়েছে বলে জানান। মিরসরাই উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা আরিফুর রহমান জানান, ওসমানপুর ইউনিয়নের মাছচাষিরা নিজ এলাকায় ১৫ হাজার একর ও আশপাশের বিভিন্ন উপজেলায় আরও ২৫ হাজার একর এলাকায় মাছ চাষ করছেন। উচ্চ ঘনত্বের চাষপদ্ধতি অবলম্বন করায় এই এলাকার চাষিরা প্রতি একরে ১০ থেকে ১২ টন তেলাপিয়া ও কার্প-জাতীয় মাছ উৎপাদন করতে পারেন এবং ভালো মানের ফিড ব্যবহারের কারণে এখানকার মাছ নিরাপদ ও সুস্বাদু বলে উল্লেখ করেন তিনি।
চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের ওসমানপুর ইউনিয়নে বাণিজ্যিক মাছ চাষে এসেছে বিপ্লব। একসময় সাধারণ পেশায় থাকা বহু মানুষ এখন মাছ চাষ করে কোটিপতি হয়েছেন।



0 মন্তব্যসমূহ