চট্টগ্রামের পটিয়ায় অবস্থিত প্রায় দুই শ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী থানার হাট গ্রামীণ অর্থনীতি ও মানুষের জীবিকার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। ইতিহাস গ্রন্থ অনুযায়ী, ঔপনিবেশিক আমলে পটিয়ায় থানা প্রতিষ্ঠার আগেই পটিয়া আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের সামনের এলাকায় হাটটি বসিয়েছিলেন রামসুন্দর মিস্ত্রি নামের এক জমিদার। সে সময় এটি রামসুন্দর মিস্ত্রির হাট নামে পরিচিত হলেও পরবর্তীতে থানার হাট হিসেবে খ্যাতি লাভ করে। প্রবীণ শিক্ষক ও বাসিন্দাদের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে, অতীতে বটতলার এই হাটে মাটির ঘর ও ঝুপড়িতে চলত কেনাবেচা। বিকেলে সেখানে বসত গানের আসর এবং সন্ধ্যার পর চেরাগ জ্বালিয়ে কেনাবেচা চালিয়ে নেওয়া হতো। পটিয়া আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক মো. মিজানুর রহমান জানান, ১৯৭৫-৭৬ সালের দিকেও বটগাছের নিচে এই হাট বসত এবং সে সময় জিনিসের দাম বেশ কম ছিল। পটিয়া সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল আলিম উল্লেখ করেন, এই হাট কেবল পণ্য বিনিময়ের কেন্দ্র ছিল না, বরং এটি ছিল লোকজ বিনোদন ও মানুষের দেখা-সাক্ষাতের মাধ্যম। সময়ের বিবর্তনে এবং নানা পালাবদলে ১৯৭৯ সালের দিকে হাটটি ম্যাজিস্ট্রেট আদালত চত্বরে নেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে পটিয়া রেলস্টেশনের পেছনের প্রায় চার একর জায়গায় বর্তমান নতুন থানার হাট গড়ে ওঠে। পৌরসভা ও থানার হাট পৌর বাজার ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে নিয়মিত হাটের দিনে দুই থেকে আড়াই লাখ ক্রেতা-বিক্রেতার সমাগম ঘটে এবং এক হাজারের বেশি বিক্রেতা সেখানে পসরা সাজিয়ে বসেন। গোবিন্দারখিলের কৃষক আবু তোরব ও চন্দনাইশের আখ ব্যবসায়ী আবদুল হাকিমের মতো স্থানীয় উৎপাদনকারী ও ব্যবসায়ীরা এই হাটের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। কেলিশহরের কুমারপাড়ার পাখিজা বেগম জানান, চার দশক ধরে মাটির তৈজসপত্র তৈরি করে তিনি এই হাটেই তা সরবরাহ করে আসছেন। থানার হাট পৌর বাজার ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম জানান, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই হাট গ্রামের উৎপাদন ও মানুষের জীবিকার যোগসূত্র রক্ষা করে আসছে। তবে হাটের দখল হওয়া অংশ উদ্ধার এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে এটি আগামী প্রজন্মের জন্য আরও সমৃদ্ধ একটি বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
দুই শ বছরের পুরোনো চট্টগ্রামের পটিয়ার থানার হাটের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন।


0 মন্তব্যসমূহ