দেশবরেণ্য চিত্রশিল্পী, ভাষাসংগ্রামী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মুস্তাফা মনোয়ার ৯০ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। বাঙালির শিল্পচর্চার ভুবনে এক আইকনিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে তিনি তাঁর কর্ম, ব্যক্তিত্ব ও দেশপ্রেমের মাধ্যমে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। ১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর মাগুরার শ্রীপুর থানার নাকোল গ্রামে জন্মগ্রহণ করা এই শিল্পীর বাবা ছিলেন প্রখ্যাত কবি গোলাম মোস্তফা এবং মা জামিলা খাতুন। ছয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট।
মুস্তাফা মনোয়ারের শিল্প জীবনের সূচনা হয়েছিল শৈশবেই। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় নবম শ্রেণির ছাত্র থাকাবস্থায় নারায়ণগঞ্জে আন্দোলনের সমর্থনে ছবি আঁকার কারণে তিনি গ্রেফতার হয়ে কারাবরণ করেন। পরবর্তীতে ১৯৫৯ সালে কলকাতা চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় থেকে তিনি ফাইন আর্টসে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি মুজিবনগর সরকারের সাংস্কৃতিক দলের অন্যতম নেতৃত্ব প্রদান করেন। ভারতের শরণার্থী শিবিরে পাপেট শোর মাধ্যমে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতা তুলে ধরে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব প্রচার করে তিনি শরণার্থীদের মানসিক শক্তি জুগিয়েছেন, যার ফলে তিনি ‘পুতুলওয়ালা’ হিসেবে পরিচিতি পান। তাঁর এই কার্যক্রম মার্কিন নির্মাতা লিয়ার লেভিনের ফুটেজ ও তারেক মাসুদের ‘মুক্তির গান’ চলচ্চিত্রে প্রামাণ্য দলিল হিসেবে রয়েছে।
পেশাগত জীবনে তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের জেনারেল ম্যানেজার, শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক, এফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং শিশু একাডেমির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ঢাকার কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের পেছনের লাল বৃত্তটি তাঁরই শিল্পভাবনার ফসল। এছাড়া ইউনিসেফের ‘মীনা’ কার্টুন ও জনপ্রিয় শিশুতোষ অনুষ্ঠান ‘সিসিমপুর’ নির্মাণে তাঁর বিশেষ ভূমিকা ছিল। একাত্তরের মার্চে ফজল-এ-খোদা রচিত ও আজাদ রহমান সুরারোপিত ‘সংগ্রাম সংগ্রাম সংগ্রাম’ গণসংগীতের শৈল্পিক নির্দেশনায় তিনি অসামান্য মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন, যা শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’ বইতেও উল্লিখিত আছে। শিল্পকলায় অনন্য অবদানের জন্য ২০০৪ সালে তিনি একুশে পদক এবং ২০১৯ সালে ‘সুলতান স্বর্ণ পদক’ লাভ করেন।
বরেণ্য চিত্রশিল্পী ও পাপেট সম্রাট মুস্তাফা মনোয়ারের জীবনাবসান হয়েছে। ভাষাসংগ্রামী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দেশের শিল্প-সংস্কৃতিতে তাঁর অসামান্য অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।



0 মন্তব্যসমূহ