নিজস্ব প্রতিবেদক:
বাঁশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) থাকাকালীন সময়ে বিএনপি-জামায়াতের মূর্তিমান আতংকের নাম ছিল কামাল উদ্দিন। বাঁশখালীতে বিরোধী দলের গণতান্ত্রিক আন্দোলন বা মিছিলে বাধা হয়ে দাঁড়াতেন তিনি। কখনো মন্দির পোড়ানো মামলায় বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের আসামি করা আবার কখনো নাশকতা মামলা ঠুকে দেওয়াই ছিল তার রুটিনমাফিক কাজ। গণ্ডামারা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও বহিষ্কৃত বিএনপি নেতা লেয়াকত আলীকে ডজন ডজন মামলা দিয়ে জেলে পাঠান এই বিতর্কিত ওসি। বিএনপি নেতাকর্মীদের হয়রানির কারিগর কামালকে আইনের আওতায় আনতে সম্প্রতি নেট দুনিয়া সরগরম হয়ে উঠেছে। অনেকে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে কামালকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
যোগদানের পর টার্গেট বিএনপি-জামায়াত
মো. কামাল উদ্দিন ২০২১ সালের ১৩ অক্টোবর ওসি হিসেবে যোগদান করেন বাঁশখালী থানায়। যোগদানের পর থেকে বিএনপি-জামায়াতের লোকজন ছিল তার ‘চোখের ময়লা।’ তার মেয়াদে বিএনপি-জামায়াতের লোকজনের বিরুদ্ধে হরহামেশা নাশকতা মামলা তথা গায়েবি মামলা দেওয়া হতো। বিএনপি জামায়াত নেতাকর্মীদের দমন পীড়নের পুরস্কার হিসেবে কামাল উদ্দিন ২০২১ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বর এবং ২০২২ সালের জানুয়ারি মাস টানা তিনবার চট্টগ্রাম জেলার শ্রেষ্ঠ ওসি’র স্বীকৃতি পান।
বিএনপি-জামায়াত দমনের পুরস্কার দেন স্বয়ং শেখ হাসিনা
বাঁশখালী থানার সাবেক ওসি কামাল উদ্দিনের কর্মকাণ্ডে খোদ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সন্তুষ্ট ছিলেন। দাম্ভিকতাপূর্ণ কর্মকাণ্ডের প্রতিদানস্বরূপ বাংলাদেশ পুলিশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের পুরস্কার প্রেসিডেন্ট পুলিশ মেডেল (পিপিএম) পদককে ভূষিত হন কামাল উদ্দিন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে এই পুরস্কার তুলে দেন।
জানা গেছে, কক্সবাজার জেলার রামু উপজেলার মরিচ্যা খুনিয়াপালং এলাকার বাসিন্দা ওসি কামাল উদ্দিন বিবিএ, এমবিএ (অ্যাকাউন্টিং) পাস করার পর সাব-ইন্সপেক্টর হিসেবে পুলিশে যোগ দেন ২০০৭ সালে। ২০১৬ সালে প্রমোশন পেয়ে ইন্সপেক্টর হন।
বিরোধী দল দমনের স্বীকৃতি ২০ বার
২০২৩ সালের ২৩ জুলাই ৮ম বারের মতো সেরা ওসির স্বীকৃতি পান বাঁশখালী থানার তৎকালীন ওসি কামাল উদ্দিন। গোপালগঞ্জের বাসিন্দা, চট্টগ্রাম জেলার তৎকালীন পুলিশ সুপার এস.এম শফিউল্লাহ কামালের কর্মকাণ্ডে সন্তুষ্ট ছিলেন।
ওসি কামাল উদ্দিন বাঁশখালীতে যোগদানের পর এর আগেও চট্টগ্রাম জেলার সেরা ওসি’র ৬বার স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। পর পর তিনবার ২০২১ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাস এবং ২০২২ সালের জানুয়ারী মাস । ২০২৩ সালের জানুয়ারী, এপ্রিল, মে ও জুন মাসে শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতিসহ পুরষ্কারের ঝুলিতে ৮ম বার যোগ হয়। এরপর সীতাকুণ্ড থানায় যোগদান করলে সেখানেও সেরা ওসির স্বীকৃতি পান।
অপকর্মের প্রতিবাদ করলে সাংবাদিকদের দেওয়া হতো মামলার হুমকি
সাবেক ওসি কামালের অপকর্মের প্রতিবাদ করলে সাংবাদিকদের হুমকি দিতেন তিনি। বাঁশখালীতে কর্মরত সাংবাদিক বেলাল উদ্দিন বলেন, ওসি কামালের অপকর্মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার মতো সাংবাদিক বাঁশখালীতে ছিল না। আমি ঝুঁকি নিয়ে কয়েকবার নিউজ করেছি। মনছুর আলম নামের এক সাংবাদিককে চোলাই মদ দিয়ে ফাঁসানোর পর আমি পত্রিকায় এক্সক্লুসিভ প্রতিবেদন প্রকাশ করি। এরপর একদিন থানার কম্পাউন্ডে কামাল আমাকে বলে, ‘বাঁশখালীতে বর্তমানে কয়েকটি নাশকতা মামলা চলমান আছে। তুমি পুলিশের বিরুদ্ধে লেগে আছো। তোমার নাম নাশকতা মামলায় যোগ করা হবে।’
মৃত্যুর আগ পর্যন্ত গায়েবি মামলার ঘানি টানতে হয়েছিল জাফরুল ইসলাম চৌধুরীকে
২০২২ সালের ২৫ আগস্ট কেন্দ্র ঘোষিত সমাবেশের অংশ হিসেবে জ্বালানি তেল ও নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিসহ অসহনীয় লোডশেডিং এবং ভোলায় গুলিতে নূরে আলম ও আবদুর রহমানের মৃত্যুর প্রতিবাদে উপজেলা বিএনপির পক্ষ থেকে মিছিলের অনুমতি চাওয়া হয়। পুকুরিয়া থেকে পুঁইছড়ি পর্যন্ত বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করার অনুমতি চেয়েছিল বাঁশখালী উপজেলা বিএনপি। কিন্তু সমাবেশের অনুমতি দেননি তৎকালীন ওসি কামাল উদ্দিন। সমাবেশের অনুমতি না পেয়ে ২৬ আগস্ট বাঁশখালী প্রধান সড়কের গুণাগরী এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল করার চেষ্টা করে উপজেলা বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। পরে পুলিশ ও আ.লীগের নেতাকর্মীদের বাধায় সাবেক বন ও পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির তৎকালীন সভাপতি জাফরুল ইসলাম চৌধুরীর পশ্চিম গুণাগরীর বাড়ির সামনে সমাবেশের আয়োজন করে উপজেলা বিএনপি।
সেদিন জাফরুল ইসলাম চৌধুরীর বাড়ির সামনে গিয়ে ওসি কামাল উদ্দিনসহ বাঁশখালী থানা পুলিশের বিপুল সদস্য বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর লাঠিচার্জ করে। এ ঘটনায় চট্টগ্রাম দক্ষিণ ছাত্রদলের প্রয়াত সভাপতি শহীদুল আলম শহীদসহ একাধিক নেতাকর্মী আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
পৃথক তিনটি মামলায় বিএনপি নেতাকর্মীদের নির্ঘুম রাত
সেদিন বিএনপি নেতাকর্মীদের মেরেও ক্ষান্ত হননি কামাল উদ্দিন। পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগ এনে একে একে তিনটি মামলা করেন বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। সাবেক বন ও পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী জাফরুল ইসলাম চৌধুরীকে প্রধান আসামি করে ৬৬ জনের নাম উল্লেখ করে তিন মামলায় ৪৫০ জনকে আসামি করা হয়। মামলার অজ্ঞাত আসামি ৩০০ থেকে ৪০০ জন। পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগ এনে পৃথক তিনটি মামলায় পুরুষ শূন্য হয়ে যায় বাঁশখালীর প্রত্যন্ত অঞ্চল। বিএনপির নেতাকর্মীরা সেদিন কেউ পাহাড়ে, কেউ ধান ক্ষেতে আবার কেউ পার্শ্ববর্তী পেকুয়া ও চকরিয়া উপজেলার আত্নীয়-স্বজনের বাড়িতে রাত কাটান।
পটিয়ার ঘটনা দেখিয়ে বাঁশখালীতে গ্রেপ্তার জামায়াত নেতা
২০২৩ সালের ৩১ জুলাই নাশকতা মামলায় চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জামায়াতের সাংগঠনিক সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় সুরা সদস্য এডভোকেট আবু নাছেরসহ ৫ জামায়াত নেতা-কর্মীকে কারাগারে পাঠান বিতর্কিত ওসি কামাল উদ্দিন।
২০২৩ সালের ৩১ জুলাই কারাগারে পাঠানো হয় চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জামায়াতের সাংগঠনিক সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় সুরা সদস্য এডভোকেট আবু নাছের (৪০), শীলকূপ ইউনিয়ন জামায়াতের সাধারণ সম্পাদক মো. মোক্তার আহমদ (৪৪), পৌরসভা ৬নং ওয়ার্ড জামায়াতের সভাপতি ছিদ্দিক আহম্মদ (৪৮), শেখেরখীল ইউনিয়নের জামায়াতের সদস্য কবির হোসাইন ফারুকী (৪২), পৌরসভা জামায়াতের সদস্য দেলোয়ার হোসেনকে (৩৩)।
সেদিন বাঁশখালী থানার তৎকালীন ওসি মো. কামাল উদ্দিন পিপিএম সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘পটিয়া থানার বিভিন্ন জায়গায় নাশকতা চালায় গ্রেফতারকৃতরা। এতে নাশকতা সৃষ্টির ঘটনায় জড়িত থাকার অপরাধে বাঁশখালীর বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে আগেও বিভিন্ন থানায় নাশকতা, সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ, গাড়ি ভাংচুরসহ একাধিক মামলা রয়েছে।’
সেই কামাল এখন কোথায়?
২০২৩ সালের ৭ ডিসেম্বর বাঁশখালী থানার তৎকালীন ওসি কামাল উদ্দিনকে সীতাকুণ্ড থানায় বদলি করা হয়। অপরদিকে সীতাকুণ্ড থানার ওসি তোফায়েল আহমদকে বাঁশখালীতে বদলি করা হয়। জুলাই অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর সীতাকুণ্ড থানার ওসি কামাল উদ্দিনকে অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) কুড়িগ্রাম জেলা ইউনিটে বদলি করা হয়। তবে তার বর্তমান কর্মস্থল সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি।
কামালের বিচারের দাবিতে সোচ্চার বিএনপি নেতারা
বাঁশখালী থানার সাবেক এই ওসির বিচারের দাবিতে ফেসবুকে বিএনপি নেতাকর্মীদের স্ট্যাটাস দিতে দেখা গেছে। স্ট্যাটাসে সেই দুঃসময়ের স্মৃতিচারণ করেছেন এবং কামালের বর্তমান কর্মস্থল জানতে চেয়েছেন।
বাহারছড়া ইউনিয়ন বিএনপি নেতা জালাল উদ্দিন চৌধুরী বলেন, তৎকালীন ওসি কামাল বাঁশখালীর রাজনৈতিক সহাবস্থান নষ্ট করেন এবং গায়েবী মামলার প্রচলন করেন। তিনি ছাত্রদল, যুবদল ও বিএনপির শত শত নেতাকর্মীকে মামলায় জড়িয়ে জেলে পাঠান। মন্দির ভাঙচুরের মিথ্যা অভিযোগে চট্টগ্রামে ৭টি মামলা হয়, যার মধ্যে ৩টি বাঁশখালী থানায়। সাবেক এমপি ও প্রতিমন্ত্রী আলহাজ্ব জাফরুল ইসলাম চৌধুরীর বিরুদ্ধেও ৩টি মামলা দেওয়া হয়।
জালাল উদ্দিন দাবি করেন, ২০২২ সালের ৪ নভেম্বর তাজুল ও সেলিম গংয়ের টাকা খেয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তিনি ৩ মাস ১৫ দিন কারাভোগ করেন। পরে এ বিষয়ে মামলা করতে চাইলেও দলের ভেতর থেকেই বাধা দেওয়া হয়।
নুর মোহাম্মদ নামের আরেক বিএনপি নেতা বলেন, সে আমাকে জাফরুল ইসলামের বাড়িতে মিটিং শেষে বাজার থেকে তুলে থানার পূর্ব পাশে কালিবাড়ির সামনে নিয়ে যায়। সেখানে আমাকে বলে, ছেলেকে ফোন করার জন্য। ফোন করার পর ছেলে থানায় এলে কামাল ১ লাখ ২০ হাজার টাকা দাবি করে। আমি অপরাধ জানতে চাইলে বলা হয়, জাফরুল ইসলামের বাড়িতে যাওয়া-ই আমার অপরাধ এবং আমার ছবি দেখানো হয়। অসুস্থ ও বয়স্ক হওয়ায় বাধ্য হয়ে টাকা দিতে হয়। আমি বিএনপি করি—এটাই ছিল আমার মূল ‘অপরাধ’।
সরল ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান লেয়াকত আলী তালুকদার বলেন, ‘আমি ৫ আগস্টের পর ওসি কামালের বিরুদ্ধে মামলা করেছি। সে বিভিন্ন জায়গায় লবিং করে মামলার তদন্ত কাজ আটকে রেখেছে। অনেক টাকা খরচ করেছে। এমতাবস্থায় ন্যায় বিচার পাবো কিনা জানি না। ওসি কামাল বাঁশখালীতে দায়িত্ব পালনকালে সাবেক এমপি মোস্তাফিজের নির্দেশে আমাকে অসহনীয় নির্যাতন করেছে। আমার বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছে। ইউপি নির্বাচনে আমার বিরুদ্ধে তার পুলিশকে লেলিয়ে দিয়ে আমার ফলাফল কেড়ে নিয়েছে।’
সূত্র: বাঁশখালী টুডে



0 মন্তব্যসমূহ