চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য জেলাগুলোতে সাম্প্রতিক বন্যায় প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। গত ৫ জুলাই থেকে শুরু হওয়া টানা আট দিনের অতি ভারী বর্ষণে চট্টগ্রাম বিভাগে ৪১ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৪ হাজারের বেশি ঘরবাড়ি। তবে স্থানীয় বাসিন্দা ও বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিপর্যয়ের পেছনে শুধু প্রাকৃতিক কারণ নয়, বরং মাছ চাষের জন্য খালে দেওয়া অবৈধ বাঁধ এবং স্লুইসগেটগুলোর অব্যবস্থাপনা বড় ভূমিকা রেখেছে।
চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টির পানি নামার স্বাভাবিক পথগুলো কৃত্রিমভাবে বন্ধ করে রাখা হয়েছে। কাঁথারিয়া ইউনিয়নের বাঘমারা গ্রামের কৃষক আবুল খায়ের অভিযোগ করেন, সোনাইমুড়ি খালে মাছ চাষের জন্য ইটের দেয়াল তুলে পানিপ্রবাহ সংকুচিত করায় তার ঘরবাড়ি দীর্ঘ সময় তলিয়ে ছিল। স্থানীয়দের দাবি, সাবেক ইউপি সদস্য মো. আনসার রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এই প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছিলেন। যদিও আনসার এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
একই চিত্র দেখা গেছে বাহারছড়া ইউনিয়নের রত্নপুর গ্রামেও। সেখানে স্লুইসগেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রাজনৈতিক পালাবদলের প্রভাব এবং মাছ চাষের স্বার্থে গেট বন্ধ রাখার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, আগে আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টরা এবং বর্তমানে বিএনপি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এই গেট নিয়ন্ত্রণ করছেন, যার ফলে বন্যার সময় পানি সময়মতো নামতে পারেনি।
কক্সবাজারের চকরিয়া ও মাতামুহুরী অঞ্চলেও একই সংকট দেখা দিয়েছে। ঢেমুশিয়া ক্রসড্যাম স্লুইসগেটটি মাছ ধরার সুবিধার্থে বন্ধ রাখার অভিযোগ তুলেছেন পরিবেশকর্মী আলাউদ্দিন আলো। এর ফলে সাতটি ইউনিয়নের প্রায় ৮৫ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়। পরে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে গেটটি খোলা হলেও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমানো সম্ভব হয়নি।
ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের (আইডব্লিউএম) ২০১৭ সালের এক জরিপ অনুযায়ী, বাঁশখালীতে পাউবোর ৮৯টি স্লুইসগেটের বিপরীতে অন্তত ১৫৭টি অবৈধ প্রতিবন্ধকতা শনাক্ত করা হয়েছিল। বর্তমানে পাউবোর ৭০টি গেট টিকে থাকলেও তার মধ্যে ১৪টি অকার্যকর এবং ১৯টি গেটের কোনো অস্তিত্বই নেই। পাউবোর চট্টগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী তানজীর সাইফ আহমেদ জানান, অধিকাংশ গেট পাকিস্তান আমলে নির্মিত হওয়ায় সেগুলো বর্তমানের পানির চাপ সামলাতে সক্ষম নয়।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ও পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত বলেন, উপকূলীয় বাঁধগুলো মূলত জোয়ার ঠেকানোর জন্য তৈরি, কিন্তু ভেতরের পানি বের করার বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি। তিনি অবৈধ বাঁধ অপসারণ এবং পানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে রেখে জনস্বার্থে পরিচালনার ওপর জোর দেন।
চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে সাম্প্রতিক বন্যায় ৪১ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। মাছ চাষের জন্য খালে অবৈধ বাঁধ ও স্লুইসগেট বন্ধ রাখায় পানি সরতে না পেরে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেড়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।



0 মন্তব্যসমূহ