◾একমঞ্চে জুলাই যোদ্ধারা ও ‘আন্দোলনবিরোধী’ উপস্থিতি
◾এমপি তোষণ ও আন্দোলনের বিরুদ্ধে অপপ্রচার
◾দায় অস্বীকার সাবেক এমপির
◾সহকর্মীদের ওপর চাপের অভিযোগ
◾জনরোষ, চাকরিচ্যুতি ও খোলস বদলের রাজনীতি
◾প্রশাসনের নীতি ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রশ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ঐক্য রক্ষার অঙ্গীকারে আয়োজিত উপজেলা প্রশাসনের এক সংবেদনশীল অনুষ্ঠানে স্থান পেয়েছেন আন্দোলনকালীন ছাত্র-জনতাবিরোধী ভূমিকার জন্য অভিযুক্ত সংবাদকর্মী শফকত হোসাইন চাটগামী। গত ১৬ জুলাই বাঁশখালী উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত ‘জুলাই শহীদ দিবস’-এর সর্বদলীয় সভা ও দোয়া মাহফিলে তাঁর উপস্থিতি ঘিরে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গন, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও সচেতন মহলে তোলপাড় শুরু হয়েছে।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে ‘নাশকতা’ হিসেবে চিহ্নিত করা এবং সাবেক ফ্যাসিস্ট সরকারের দলীয় এমপিদের সহযোগী হিসেবে পরিচিত এক ব্যক্তির রাষ্ট্রীয় এই মঞ্চে উপস্থিতি ‘শহীদের রক্তের সঙ্গে সরাসরি বিশ্বাসঘাতকতা’ বলে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন গণঅভ্যুত্থানের স্টেকহোল্ডাররা।
গত ১৬ জুলাই অনুষ্ঠিত উক্ত সভায় বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক কমিটি (এনসিপি), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধি এবং আন্দোলনে আহত যোদ্ধারা একমঞ্চে উপস্থিত ছিলেন। ফ্যাসিবাদের দোসরদের প্রতিহত করার হুঙ্কার দেওয়া এই আয়োজনের প্রথম সারিতেই চাটগামীর অবস্থান পুরো অনুষ্ঠানকেই বিতর্কিত করে তোলে।
ঘটনার পর পরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। বাঁশখালীর জামায়াত নেতা বোরহান উদ্দিন জায়েদ নিজের প্রতিক্রিয়ায় লেখেন, “আজকের বাঁশখালী উপজেলা প্রশাসনের জুলাই শহীদ দিবসে জুলাই আন্দোলনকে 'নাশকতা' বলা সাংবাদিক নামের সাংঘাতিক শফকত চাটগামী নামের এই লোকটিও জায়গা করে নিল! খুবই লজ্জাজনক এবং দুঃখজনক।”
অনুরূপ ক্ষোভ প্রকাশ করে জুলাই যোদ্ধা আরিফুল ইসলাম গাজী বলেন, “চাটগামীর মতো স্বৈরাচারের দোসর কীভাবে জুলাই শহীদ দিবসের অনুষ্ঠানে দাওয়াত পায়? বাঁশখালী উপজেলা প্রশাসন কিছুতেই এর দায় এড়াতে পারে না। এটি চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা।”
প্রাপ্ত তথ্যাদি পর্যালোচনা করে জানা যায়, সাবেক বিতর্কিত ও স্বৈরাচারী এমপি মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ অনুসারী ছিলেন শফকত হোসাইন চাটগামী। বিগত ১৭ বছরের আওয়ামী শাসনামলে প্রভাব বিস্তার করে তিনি অনৈতিক সুবিধা হাসিল করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সংসদ সদস্য পরিবর্তনের পর চাটগামী আরেক সাবেক এমপি মুজিবুর রহমান সিআইপির বলয়ে যুক্ত হন।
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের রক্তঝরা দিনগুলোতে আন্দোলন দমনে সাবেক সংসদ সদস্যদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে চাটগামী তথ্যগত কৌশল অবলম্বন করেন। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে চাটগামী তাঁর ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাবেক এমপি মুজিবুর রহমান সিআইপির বরাতে একটি বিতর্কিত পোস্ট প্রচার করেন। সেখানে বাঁশখালীর পুকুরিয়া, কালীপুর, বৈলছড়ি, চাম্বল, গুণাগরী ও পুঁইছড়িতে আন্দোলনকারীদের অবস্থানকে ‘নাশকতা ও নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশকে কঠোর অবস্থানের বার্তা দেওয়া হয়। এতে সাধারণ শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক কর্মীরা সরাসরি নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়েছিলেন।
বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ করা হলে সাবেক এমপি মুজিবুর রহমান সিআইপি চাটগামীর স্ট্যাটাসের দায় অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, “গণঅভ্যুত্থানের সময় আমি আন্দোলনকারীদের জন্য খাবার সরবরাহ করেছি, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে ছাতা দিয়েছি। চাটগামী আমার বরাতে যে স্ট্যাটাস দিয়েছে, তা আমার অনুমোদিত ছিল না। সে মনগড়া ও অতিরঞ্জিত বক্তব্য প্রচার করেছে।”
অন্যদিকে, সহকর্মী সাংবাদিকদের ওপর চাপের অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। বাঁশখালীর স্থানীয় সাংবাদিক মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন জানান, আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় চাটগামী তাঁকে নানাভাবে হুমকি ও চাপ প্রয়োগ করেন। এমনকি ছাত্রলীগের চিহ্নিত ক্যাডারদের দিয়ে টেলিফোনে ভয়ভীতি দেখানোর চেষ্টা করা হয়।
৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দিনেই চাটগামীর বিতর্কিত ভূমিকার কারণে জনরোষ সৃষ্টি হয়। প্রত্যক্ষদর্শী সংগীতশিল্পী নুরুল আবছার জানান, ৫ আগস্ট বিকেলে ক্ষুব্ধ আন্দোলনকারীরা চাটগামীর বাসভবনে গিয়ে তাঁকে ধাওয়া করে এবং তাঁর মোবাইল ফোন ভাঙচুর করে।
জনরোষের মুখে চাটগামী তাঁর দুটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট নিষ্ক্রিয় করে আত্মগোপনে চলে যান। পরবর্তীতে পরিস্থিতি কিছুটা শিথিল হলে নতুন নামে অ্যাকাউন্ট খুলে পুনরায় সক্রিয় হন।
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে স্পষ্ট বিরোধিতার কারণে চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত দৈনিক পূর্বদেশ ও দৈনিক বীর চট্টগ্রাম মঞ্চ কর্তৃপক্ষ তাঁকে তাৎক্ষণিকভাবে অব্যাহতি দেয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর খোলস বদলে তিনি দৈনিক খবরের কাগজ এবং দৈনিক সাঙ্গু-র প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব বাগিয়ে নেন।
জুলাই আন্দোলনে নেতিবাচক ভূমিকা রাখা একজন বিতর্কিত ব্যক্তি কীভাবে উপজেলা প্রশাসনের একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল রাষ্ট্রীয় আয়োজনে আমন্ত্রণপত্র পান, তা নিয়ে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও তদারকি নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে।
ঘটনার বিষয়ে বক্তব্য জানতে বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুহুল আমিনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। প্রশাসনের এই নীরবতাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় সচেতন মহল ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে অসন্তোষ আরও ঘনীভূত হচ্ছে।


0 মন্তব্যসমূহ