করোনা মহামারি পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে চিনির ব্যবহারে বড় ধরনের ধস নেমেছে। গত পাঁচ বিপণন মৌসুমে দেশে চিনির ব্যবহার প্রায় ৩৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যা বিশ্বের প্রধান চিনি ব্যবহারকারী দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ হ্রাসের হার। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) সাম্প্রতিক তথ্যে এই চিত্র উঠে এসেছে। মূলত স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি, চিনির উচ্চমূল্য এবং বাজারে চিনিমুক্ত পণ্যের সহজলভ্যতাকে এই পরিবর্তনের প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইউএসডিএর তথ্যমতে, ২০২১-২২ মৌসুমে দেশে চিনির ব্যবহার ছিল ২৭ লাখ ৬৭ হাজার টন, যা ২০২৫-২৬ মৌসুমে ১৮ লাখ ৬৩ হাজার টনে নেমে আসার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। বৈশ্বিক পরিসরে চিনির ব্যবহার বাড়লেও বাংলাদেশে এই প্রবণতা সম্পূর্ণ বিপরীত। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, চিনির আমদানিও উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। ঢাকার বাসিন্দা আল আমিন এবং চট্টগ্রামের মনসুর আলমের মতো অনেক ভোক্তাই এখন ডায়াবেটিস ও ওজন নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে চিনি এড়িয়ে চলছেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় মানুষের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন জানান, অতিরিক্ত চিনি ওজন বৃদ্ধি ও বিপাকীয় রোগের ঝুঁকি বাড়ায়, তাই মানুষ এখন সচেতন হচ্ছে। এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের জনস্বাস্থ্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তুহিন বিশ্বাস মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবেও মানুষের আচরণগত ও খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আসছে।
টি ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান শাহ মঈনুদ্দিন হাসান জানান, মানুষ এখন দুধ-চায়ের বদলে রং-চা এবং চিনি ছাড়া চা পানে বেশি আগ্রহী। এদিকে, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, বাজারে চিনিমুক্ত পণ্যের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। চিনির বিকল্প হিসেবে সুক্রালোজের আমদানি গত পাঁচ বছরে প্রায় ৩৭৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল জানান, বর্তমান চাহিদা বিদ্যমান কারখানাগুলো দিয়েই মেটানো সম্ভব হওয়ায় এই খাতে নতুন বড় বিনিয়োগের প্রয়োজন হচ্ছে না। বর্তমানে বাজারে চিনির দাম চড়া হওয়ায় সাধারণ মানুষ বিলাসী ভোগ কমিয়ে দিয়েছেন বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
স্বাস্থ্যসচেতনতা ও উচ্চমূল্যের প্রভাবে বাংলাদেশে চিনির ব্যবহার ৩৩ শতাংশ কমেছে। ডায়াবেটিস ঝুঁকি এড়াতে ও খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনে মানুষ এখন চিনিমুক্ত পণ্যের দিকে ঝুঁকছে বলে জানাচ্ছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো।



0 মন্তব্যসমূহ