পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী বহুফসলি জুমচাষ এখন অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়েছে। জমি সংকোচন, পরিবেশগত চাপ এবং নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহের কারণে পাহাড়ের এই প্রাচীন কৃষিপদ্ধতি ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার সীমানাপাড়ার ৭২ বছর বয়সী জুমচাষি বনেরঞ্জন ত্রিপুরা জানান, বয়সের ভারে এবং শ্রমিক সংকটে আগামী বছর থেকে তিনি আর জুম করতে পারবেন কি না তা নিয়ে সংশয়ে আছেন। তার তিন ছেলে ও তিন মেয়ের কেউই এখন আর এই পেশায় নেই। আগে যেখানে ১০ থেকে ১২ বছর পর পর একই পাহাড়ে জুম চাষ করা হতো, এখন জমির অভাবে মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে চাষ করতে হচ্ছে। ফলে মাটির উর্বরতা কমছে এবং ফলন বাড়াতে সার ও কীটনাশক ব্যবহার করতে হচ্ছে।
চাকমা সার্কেলের প্রধান রাজা দেবাশীষ রায় বলেন, আদিবাসী মানুষ জমিকে আঘাত করতে চায় না বলে জুমে সামান্য মাটি খুঁড়ে বীজ বোনা হয়। এটি কেবল কৃষি নয়, বরং একটি জীবনদর্শন। তবে গত কয়েক দশকে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং বাণিজ্যিক বাগান ও পর্যটন প্রকল্পের কারণে জুমের জন্য উন্মুক্ত জমি কমে গেছে। খাগড়াছড়ির কুমারধনপাড়ার মঞ্জু বিকাশ ত্রিপুরা জানান, তার শিক্ষিত সন্তানরা আর পাহাড়ে ফিরে জুম চাষ করতে আগ্রহী নন। একই গ্রামের দীপন ত্রিপুরাসহ অনেক তরুণ এখন পোশাকশিল্পে কাজ করছেন। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে জুমের জমি কমলেও ফলের বাগান বাড়ছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক খালেদ মিসবাহুজ্জামান জানান, জুমকে কেবল পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর বলা ঠিক নয়, বরং নানা কারণে জুমের জমি সংকুচিত হয়েছে। রাঙামাটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (শস্য) মো. আমিনুর ইসলাম পাহাড় পোড়ানোর চর্চাকে নেতিবাচক হিসেবে দেখছেন। এদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অসময়ে অতিবৃষ্টি ও তীব্র তাপপ্রবাহ জুমচাষকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে বলে জানান আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশিদ। জাবারাং কল্যাণ সমিতির নির্বাহী পরিচালক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা জানান, তারা জুমের ঐতিহ্যবাহী বীজ সংরক্ষণে কাজ করছেন। পাহাড়ের এই আদি কৃষি ও জীবনব্যবস্থা রক্ষায় ভূমির অধিকার ও টেকসই ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
পার্বত্য চট্টগ্রামে জমি সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন ও নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহে কমছে ঐতিহ্যবাহী জুমচাষ। একসময়ের প্রধান এই কৃষিপদ্ধতি এখন অস্তিত্ব সংকটে। বিস্তারিত জানুন পাহাড়ের এই বদলে যাওয়া জীবনচিত্র নিয়ে।



0 মন্তব্যসমূহ