Recents in Beach

Google Play App

ক্যান্সারে আক্রান্ত চকরিয়ার মেধাবী ছাত্রী আফরিন বাঁচতে চায়

সময় এখন তার হেসে খেলে বেড়ানোর। বিদ্যালয়ে সহপাঠীদের নিয়ে একসঙ্গে পথচলার। কিন্তু না, মরণব্যাধি ক্যান্সার তার শরীরে বাসা বেঁধেছে। এক বছর ধরে সময় কাটছে বিছানায়। ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়ছে তার শরীর। এই একজনের চিকিৎসা ব্যয় চালাতে গিয়ে এলোমেলো হয়ে গেছে পরিবারের অন্যদের জীবনও। অন্যদশ শিক্ষার্থীর মতো জীবনে স্বপ্ন ছিল পড়ালেখা করে একদিন বড় হয়ে ডাক্তার হবে। সমাজ ও দেশের মানুষের সেবা করবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন মরণব্যাধী ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে আটকে আছে দরিদ্র বাবার পলিথিন ঢাকা ভাঙা ঘরের মাটির বিছানায়। হাঁটুতে ধরা পড়েছে বোন ক্যান্সার।
বলছিলাম আফরিন জান্নাত (১৫) নামের মেধাবী ছাত্রীর কথা। কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার বিএমচর ইউনিয়নের দক্ষিণ বহদ্দারকাটা এলাকার মোহাম্মদ শফির মেয়ে। শফি একসময় বালু শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। ২০১৭ সালে অনুষ্ঠিত জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীক্ষায় জিপিএ ৪ দশমিক ৬০ পেয়েছে আফরিন। ২০১৮ সালে নবম শ্রেণিতে মানবিক বিভাগে ভর্তি হলেও ফেব্রুয়ারি থেকে আর ক্লাসে যেতে পারেনি সে।
সরেজমিনে দেখাগেছে, হতদরিদ্র মোহাম্মদ শফি চার মেয়ে দুই ছেলেকে নিয়ে থাকেন একটি ভাঙা ঝুপড়ি বাড়িতে। ঘরের চালা ভেঙে যাওয়ায় পলিথিন দিয়ে ঢেকে কোনরকম রোদ বৃষ্টি থেকে রক্ষা করে চালিয়ে যাচ্ছেন তার জীবন সংসার। ঘরের ভিতরে গিয়ে দেখা যায়, ঘরে কোন আসবাবপত্র নেই। মাটি দিয়ে বানিয়েছেন থাকার বিছানা। এখন এ মাটির বিছানায় শুয়ে বসেই নীরবে চোখের জ্বল ফেলে কাটছে মেধাবী ছাত্রী স্বপ্নকাতর আফরিনের জীবন। কখনো কখনো ব্যথার যন্ত্রণা সইতে না পেরে চিৎকার করে আহাজারি করেন। কখনো নিরবে চোখের পানি ফেলেন। মা রেনুআরা বেগম আর ছোটবোন আশরাফুল জন্নাত সবসময় থাকেন তার পাশেই।
মোহাম্মদ শফি ও রেনোয়ারা বেগম দম্পতির বড় ছেলে তারেক আজিজ কাজ নিয়েছেন তরকারির আড়তে। মেঝ ছেলে পোশাক কারখানায়। বড় মেয়ে জন্নাতুল নাইম এইচএসসি পরীক্ষার্থী থাকা অবস্থায় একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কাজ নিয়েছেন। মেঝ মেয়ে জন্নাতুল বকেয়া পেকুয়া শহীদ জিয়াউর রহমান উপকূলীয় কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। তিনিও এখন টিউশনী করেন। আফরিনের ছোট বোন আশরাফা জান্নাত বহদ্দারকাটা উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী। আফরিনের চিকিৎসা খরচ চালাতে ও পরিবারের ঘ্লানি টানতে গিয়ে এখন পরিবারের অন্যদের পড়ালেখাও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
আফরিনের বাবা মোহাম্মদ শফি জানিয়েছেন, ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত আফরিনের চিকিৎসায় সাত লাখ ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ১০ শতকের এক খন্ড জমি ছিল, তাও তিন লাখ টাকায় বিক্রি করে দিয়েছেন। এখন আর চিকিৎসার ব্যয় মেঠাতে পারছেন না তিনি।
আফরিন বলে, ২০১৭ সালে জেএসসি পরীক্ষা দেওয়ার সময় বাম পায়ে প্রথম ব্যথা অনুভুত হয়। ধীরে ধীরে ব্যথা বাড়তে থাকে। ২০১৮ সালের ফ্রেব্রুয়ারি থেকে অন্যের সাহায্য ছাড়া হাঁটাচলা বন্ধ হয়ে যায়। এখন বিছানা থেকে উঠতে পারি না। বাম পায়ের হাটু পুরো ফুলে গেছে। তীব্র ব্যথা, ইচ্ছে হয় মরে যাই। মরে গেলেই তো সব শেষ!
দু’মিনিট পরেই আফরিন বলে, উঠে ‘আমি বাঁচতে চাই। পৃথিবীতে এতো মানুষ থাকতে আমি মারা যাবো!’ এ কথা বলেই আফরিন অশ্রুভেজা চোখে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে অন্য মনস্ক হয়ে পড়ে। বিছানায় তার পাশে সাধারণ জ্ঞানের একটি বই আছে। সে বইটি হতে তুলে নিয়ে আবার কথা শুরু হয় তার, ‘এ বইয়ের সব আমার মুখস্থ। আমি জেএসসিতে জিপিএ-৫ পেতাম। কিন্তু হাঁটুর ব্যাথায় ভালো করে পড়তে পারিনি। আচ্ছা, আমি কি বাঁচবো! যদি বেঁচে থাকি তাহলে আমি দেশের সেবা করতে করবো। সব ক্যান্সার রোগীর জন্য কাজ করবো। তাঁদের পাশে থাকবো।’ আদৌ তার এ স্বপ্ন পূরণ হবে! নাকি স্বপ্নের মৃত্যু ঘটবে-এখন সেটাই বড় প্রশ্ন।
আফরিনের বাবা বলেন, ১২-১৫ দিন পর চার ব্যাগ করে রক্ত দিতে হয়। প্রতিবার রক্ত দেওয়ার পর কেমোথেরাপি দিতে হয়। রক্ত ও কেমোথেরাপি চকরিয়ার কোথাও দেয়া যায় না। এটার জন্য চট্টগ্রাম চলে যেতে হয়। আফরিন সোজা হয়ে বসতে পারে না। একারণে গাড়ি রিজার্ভ করতে হয়। তিনি বলেন, তার চিকিৎসার খরচ বহন করতে গিয়ে আমি এখন নি:স্ব। মাথা গোজার জায়গাটি ছাড়া আমার আর কিছু নেই।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রেডিওথেরাপি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ এম এ আউয়াল আফরিনের শরীরে বুন ক্যান্সার শনাক্ত করেন। এম এ আউয়াল বলেন, ‘ভালো চিকিৎসা পেলে আফরিন ভালো হবে। তাকে ঢাকা বা ভারতে গিয়ে চিকিৎসা নিতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বহদ্দারকাটা উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জিনাত সোলতানা বলেন, আফরিন খুব মেধাবী ছাত্রী। জেএসসির পরে সে শারিরীকভাবে অসুস্থ হয়ে গেলে সবাই তাকে পরামর্শ দিয়ে মানবিক বিভাগে ভর্তি করাই। কিন্তু সে আর ক্লাস চালিয়ে নিতে পারেনি। এখন তার জন্য খুব খারাপ লাগছে। কয়েকবার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা মিলে আর্থিক সহযোগিতা দিয়েছিলাম। কিন্তু ব্যয়বহুল খরচে তা খুব নগন্য।
স্থানীয় লোকজন জানান, দেশের প্রতিটি বিত্তবানরা যদি এ রখম ক্যান্সার আক্রান্ত মেধাবী শিক্ষার্থীদের পাশে এসে একটুখানি সহযোগীতার হাত বাড়ান তাহলে একটি মেধাবী মেয়েকে বাঁচানো সম্ভব হবে। অন্যথায় চোখের সামনেই পৃথিবী থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবে একটি মেধাবী মুখ ও তার লালিত স্বপ্ন।
/কক্সবাজার নিউজ! 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য