১৯২১ সালের ১ জুলাই নবাব সলিমুল্লাহর দান করা ৬০০ একর জমিতে যাত্রা শুরু করা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে ১০৬ বছরে পদার্পণ করেছে। ৮৪৭ জন শিক্ষার্থী, ৩টি অনুষদ ও ১২টি বিভাগ নিয়ে শুরু হওয়া এই প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের প্রতিটি ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক মোড়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান পর্যন্ত প্রতিটি অর্জনেই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম জড়িয়ে আছে।
তবে ঐতিহ্যের এই ভারের বিপরীতে গবেষণার চিত্রটি বেশ ভিন্ন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে গবেষণার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে মাত্র ২১ কোটি ৫৭ লাখ টাকা, যা মোট বাজেটের মাত্র ২.০৮ শতাংশ। হার্ভার্ড, অক্সফোর্ড বা ভারতের আইআইটি মাদ্রাজের মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনায় এই বরাদ্দ অত্যন্ত নগণ্য। এই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ২০২৫ সালে স্কোপাস-ইনডেক্সড জার্নালে ১ হাজার ৭৮৯টি গবেষণাপত্র প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়টি দেশসেরা অবস্থান ধরে রেখেছে, যদিও বৈশ্বিক কিউএস র্যাঙ্কিংয়ে এর অবস্থান বর্তমানে ৫৮৪তম।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এই স্থবিরতার পেছনে ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থাকে দায়ী করা হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়, এই প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের মাটি থেকে বিচ্ছিন্ন ‘বিলেতের আমদানি টবের গাছের’ মতো। নৃবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী মোস্তফা মুশফিক তার অভিজ্ঞতায় জানান, অবকাঠামোগত সংকট, ক্লাসরুমের অভাব এবং প্রশাসনিক ধীরগতি শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ভোগান্তির কারণ। সেমিস্টার শেষে ফলাফল পেতে দেরি হওয়া বা অফিশিয়াল ওয়েবসাইট অকার্যকর থাকা শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবনের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে আবাসন সংকটের কিছুটা পরিবর্তন হলেও সামগ্রিক শিক্ষা ও রাজনীতির চিত্র এখনো অপরিবর্তিত। শিক্ষার্থীরা সৃজনশীল কর্মকাণ্ড ছেড়ে বিসিএস বা সরকারি চাকরির পেছনে ছুটছে। মোস্তফা মুশফিকের মতে, সামাজিক বিপ্লব না ঘটায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পঠনপাঠন, শিক্ষক রাজনীতি এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের কোনো গুণগত পরিবর্তন আসেনি। তবুও বহু শিক্ষার্থীর কাছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখনো এই রাজধানীতে টিকে থাকার লড়াইয়ে এক টুকরো আশ্রয়ের নাম।
১০৬ বছরে পদার্পণ করা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবময় ইতিহাস থাকলেও গবেষণায় বরাদ্দ মাত্র ২ শতাংশ। অবকাঠামোগত সংকট ও বিসিএস নির্ভরতায় শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।



0 মন্তব্যসমূহ